Thursday, March 6, 2014

বুট

বুট / পীযূষকান্তি বিশ্বাস


রক্ত মাখিয়ে যে দুটি পা দিয়েছিলে
মাংসাশী বৃটিশের মুখে
র‍্যাডক্লিফের প্রতিটা কালির আঁচড়ে
ওরা তোমাকে উদ্ভিদ করে দিয়ে গেল

আংকল, বুটের তলাটা ক্ষয়ে গেছে
এবার ওটা চিলেকোঠায় তুলে রাখো ।

আর কত বদলাবে কদম?
গ্রান্ড ট্রাংক রোডের পাশে
পিচঢাকা সড়কের ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো
বুরি নজর তেরা মুহ কালা ।

বুট দুটো তুলে রাখো আংকল
পা দুটো এখানেই থাক

আলতো পায়ে চলো ঘাস বনে ,
যেখানে চৈত্রের জ্যোৎস্না পড়েছে স্বাধীন ভূমিতে
যে পথে , পড়ে থাকা ঝরা পাতারা উড়িয়েছে
বসন্ত ডেকে এনেছে

আর পাহারা নয়,
বরং
পা-হারাই ।




Tuesday, February 4, 2014

বারুদের গন্ধ


বস্তুত রাত্রিকালীন গার্ডডিউটি সেরে ঘুমাতে যাবার কথা
চোখে ভেঙে আসছিলো সমস্ত পাহাড়
দেখছিলাম পাহাড়ে যখন বৃষ্টি নামলো
বৃষ্টির রং বদলাচ্ছিল
পাহাড়টির নাম কারাকোরাম ।

আসলে ঘুমবাহী চোখ দুটো খুঁজছিল এক হিমবাহের ঠিকানা
যেখানে কণিকারা দানা বেঁধে
হয়ে যেতে রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গন
কিংবা শিপাহীদের বরফঢাকা সমাধির উপরে
বিছিয়ে দিতে পারে এক আগুন বিছানা ।

হলুদ বসন্তের থেকে পতঝড় শীত আমার উর্দিতে
ডোরাকাটা দাগে দাগে স্পষ্ট লেগে থাকে
হেলমেটের স্ট্র্যাপে ময়লা সুতোয় আস্তরণে খানিকটা লবনের মত
যার গন্ধ খানিকটা মৃতপ্রায় ঝরনার মত
যারা ছুটে আসে চেনাবের খাদ থেকে
এসে কোন মৃত সৈনিকের নাকের উপর জুড়ে বসে
কিংবা ঘায়ে ভরা বুকের পাজরে,
পুঁজের উপরে বসে কেউ কেউ বুক ডন মারে ।

আসলে এই সব মাছিরা ওপেন-মার্কেটের হোলসেল বিক্রেতা
আর এই সব ব্যবসায়ীরা হল সেই হুন নেতা এটিলার বংশধর

আর আমার মত যারা
ষোল হাজার ফুট উচ্চতায় প্রাণের আহ্লাদে ক্যাম্প করছি ,
বেলুন ছেড়ে দিয়ে বাতাসের বেগ মাপছি
শতদ্রুর শ্বেতকায় বুদবুদের পাশে
কামানের ব্যারেলে ভরছি নিজের নিজের রক্ত ।

প্রকৃতপক্ষে ,
আমরা তো সেদিনই সাম্রাজ্যটা ভাসিয়ে দিয়েছি সিন্ধুর স্রোতে
ওদের রাজ্যপাটে আমার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহেরা
যেদিন আমার বাবা যেতো ওদের খামারে কাঠ কুড়াতে যেত
আমার মা যেতো ওদের বাড়ি বাসন মাজতে
তেরটি বসন্ত ঘুরতে না ঘুরতেই তারপর একদিন
আমার মা গর্ভবতী হলো ।

একদিন যবের সন্ধানে পেট উচু করে আমার মা ফিরছিলো
সিন্ধুর শ্যাওলায় পা পিছলে পড়েও গেলো আমার মা...
তারপর বহুদিন আমি কোন কবিতা লিখিনি
দশমাস দশদিন পরে ঘরে
জন্ম নিল গান্ধর্ব শিল্প...

আমরা যারা দেখেছি এই পঞ্চনদীর পাড়ে
ঘুম কাতর সিপাহীদের টেন্টের উপরে ঝুলে থাকা তাবু ,
ক্যাম্পে প্রতিদিন ভনভন উড়ে আসা অসংখ্য মাছিদের ঝাঁক
ওরা আমাদের বন্দুকের ট্রিগারের উপর বসে গা ঘসাঘসি করে
কেউ কেউ ঠ্যাং গলিয়ে চেটেপুটে খায়
কার্তুজের অর্ধদগ্ধ বারুদের অবশিষ্ট ।

ওরা কেউ কেউ আমার কানের কাছে ভনভন করে
গণ-সঙ্গীত গায় , মনে হয়
পাহাড় ঠেকে ঠিকরে আসছে বেস-কন্ট্রোলরুমের ওয়েলিং সাইরেন
প্রতিধ্বনিতে খান খান হয়ে যেতে চায় প্রতিশব্দগুলো
অ্যাংকলেট বুট পায়ে চড়াই ভাঙ্গি
ঘুমঘোরে পাহাড়ের চড়াই ,
আমারই পায়ের নীচে বয়ে যায় চেনাব কাদা কাদা
তাল তাল ঝিলামে অনেক বুদবুদ ঝর্ণা,
থক থক বিছিয়ে থাকে সমস্ত গিরিখাতে ...

আমি সে কাদায় পা দিই,  হাত ডুবাই , ক্রিমের মত
তাকে আমি মুখে মাখি দলা দলা,
ঠোঁটে, কপালে, গলার চারপাশে
চোখ বন্ধ করে,
দু ঠোটের উপরে নিচে জিভ দিয়ে চাটি

সবকিছুতেই আমি যেন হঠাৎ বারুদের গন্ধ পাই...

Monday, February 3, 2014

দিল্লি

দিল্লি


আরো একটু কাছে এসো সবুজ পাতা
মাটির আরো কাছে, লোধি গার্ডেনের পাথুরে উঠানে,
যেখানে সুলতানী সিপাহীদের তারুণ্যের গন্ধ এখনও মুচ মুচ,
হাতের উপরে মেলে দিয়ে শাখা প্রশাখা
সারিবদ্ধ কুচকাওয়াজের হেঁটে যাওয়া পথ

এই পথ ইন্দ্রপ্রস্থমুখী ,
তরাইন থেকে হেঁটে আসা মোহম্মদ ঘোরীর তাজা ধুলোছাপ
চুন বালি ও শ্যাওলার খাঁজে খাঁজে এখনো সফদরজংগ,
ইলতুৎমীসের প্রস্তর শহরে
যুদ্ধসজ্জায় দাঁড়িয়ে যুবক হাভিলদার

দেখ,  ঐ উঁকি মারে পোড়ামাটির কুতুব মিনার
ওখানে নজর নিবদ্ধ করো
দেখবে রাত্রির আকাশ তোমার চোখ জুড়ে ফুটিয়ে তুলেছে
হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা
কুতুবউদ্দিনের ঘোড়া !

বাবরের যে কামান একদিন ছিঁড়েছিলো পানিপথের ঢেউখেলা বুক,
ইতিহাসের খয়েরী পাতা থেকে
ঐ দেখো,  স্রোতবাহী যমুনার চরে এক পলকে চেয়ে আছে অশ্বারোহী
এক যুব রাজকুমার,
কালিন্দীকুঞ্জের অগভীর জলাশয়ে বিপ্রতীপ ছবি হয়ে 
হুমায়ুন এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে এখনো স্থির

পুরানা কিলার আঁধারে প্রস্তরীভূত হয়ে উঠেছে কবুতরের ডানা
রাঙা টিউলিপের পরাগে পরাগে জমে আছে পুরানো বিকেলের রোদ
পুকুরের কলমীর গন্ধে ভরা জলে ভেসে ভেসে
হাঁসেরা পেড়ে যাচ্ছে নিষিক্ত ডিম ...
আর দিনরাত্রি পাহারায় রাজপথে
আজ রাজধানী দিল্লি এখনো সজাগ জেগে আছে ।



Thursday, January 16, 2014

গন্তব্য


দিনগুলি চলে যায়
খাঁচাগুলো খালি করে
দিনগুলো থেকে খাঁচাগুলির স্থায়ীত্ব নিয়ে কোলাহল

কাঁচা বাঁশেও ঘর থাকে না
বাসা খসে পড়ে
বাঁশ দাঁড়িয়ে থাকে
খসে পড়ার সাথে সাথে
দিনগুলি স্বর্ণময় হইয়ে ওঠে !

পতাকাগুলো উড়তে থাকে
বাঁশে জড়িয়ে থাকে রেশমী কাপড়
রং শুধু আলাদা হয় - ক্ষণস্থায়ী
রণাঙ্গন থেকে রনাঙ্গনে

তাই শেষ ইচ্ছা যদি

প্রস্তরীভূত হয়ে যাই কোন শহীদ মিনারে । 


০২ জানুয়ারী  ২০১৪
মহাবীর এনক্লেভ, নতুন দিল্লি

Tuesday, January 14, 2014

যুদ্ধের মহড়া

যুদ্ধের মহড়া


আমারও এক বক্ষ ছিল মৃত্যুঞ্জয়ী বারুদের এক নিরাপদ ঠিকানা
জীবন ঢেলে দিয়ে চেনাবের গিরিখাতে মরণপণ যুদ্ধের রক্ত স্রোতফেনা
পাহাড়ের খাদে খাদে জমে আছে সংগ্রামী সৈনিকের  লবনাক্ত ঘাম
সাইরেনের শব্দে পায়ে ফেলে পা, বর্ষার পিচ্ছিল পথে মার্চ বাম ডান বাম
অন্ধকার টাইগার হিল, মৎসের কনীনিকা লক্ষ্যভেদে তৈরী অর্জুনের তীর
সীমানার দেশরেখা টেনে ভূতলে নেমে আসে হিংস্র এক বিপক্ষ শিবির
পুড়িয়ে আসা পতাকা,পিছে ফেলে আসা ক্যাম্প, যুদ্ধক্ষেত্রের অমোঘ নিয়তি
বাঁ পাশে গহীন খাদ ,সামনে আঁধার , ডান পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া বুলেটের গতি
উরি ড্রাস কার্গিলের পর্ণমোচী আগুনের জমে যাওয়া চাংড়া বরফ
সিন্ধুর বুঁদবুঁদ স্রোতে ভেসে যাওয়া মাছেদের সেইসব নীল মৃত চোখ...

জীবন এখনো শ্রাবন, রাজপথে দেখি শহীদের মৃত ভাইদের প্রাণপনে লড়া
আজও টের পাই শিরায় শিরায় সেই রক্ত, পায়ে পায়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মহড়া ।


০৬ জানুয়ারী  ২০১৪

মহাবীর এনক্লেভ, নতুন দিল্লি