Wednesday, October 2, 2013

মিগ টোয়েন্টি ওয়ান

মিগ টোয়েন্টি ওয়ান
----পীযূষকান্তি বিশ্বাস

করোটির দুদিকে দুটো গোল গোল কোটরে রক্তচক্ষু,
জ্বালিয়ে যুদ্ধ-জিঘাংসা
দুটো প্রসারিত চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা ডানায়
পশ্চাতে এ টি এফ ঘসে
ভুস করে উড়ে গেল সুপারসোনিক মিগ টোয়েন্টি ওয়ান
রানওয়ে শুয়ে আছে বাসর শয্যায়
সঙ্গম হবে, আগুনের মিলনমেলায় ।

এক দো এক, এক দো এক
আলফা ব্রাভো চার্লি বিদেশী অশরীরীর টাটকা রক্তে
মধ্যরাত্রির পাহাড়ি ঘাসে
বড়াখানা আজ

শিশির আর মশকের সাপ্তাহিক বনভোজনে
শীত আর অসিতের প্রহরায়
এক তরুণ এয়ারম্যান জানুয়ারীর এমনই এক অমাবস্যায়
প্যাট্রোলিং নাইট ডিউটি করে ।

[সাইড ওয়াক]
"গুড ইভনিং স্যার"
অর্থাৎঃ সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম বোরোলিন
"হাও আর ইউ, অর ক্যাইসা হ্যায়"
অর্থাৎঃবরফের ফাঁকে বুঝি ঢলে পড়ে চাঁদ
"স্ক্রাম্বল স্ক্রাম্বল"
অর্থাৎঃ বড় ভয়াবহ এ যে, বড় গতিময়
"মে ডে, মে ডে"
অর্থাৎঃখ্যাচর খ্যাচ, গাড়ি চালায় বংশীবদন
"স্টারবোর্ড ইঞ্জিন লিক"
অর্থাৎঃ শহর সে লেকে গাঁও তক চুঁইয়ে , চুঁইয়ে পড়ে দেশপ্রেম ।

[দু মিনিট কমার্সিয়াল ব্রেক]
আমি বড় হয়রান হে কমান্ডিং অফিসার , কিংকর্তব্যবিমূঢ়
কিসের যুদ্ধ এ ? কাদের লড়াই
নিজেরই বুকে ক্ষত নিয়ে কৃত্রিম সীমানার বড়াই ?
আমায় তুমি নিয়ে চল কোথাও,
হারিয়ে যাই জলঙ্গীর পারে
কৃত্রিমতার ওপারে কোন সবুজের ভিতরে ,
বারুদহীন, বারুবরণ দেশপ্রেমহীন

যেখানে কোন ধান ক্ষেত, 
কোন পল্লীর স্তব্ধতায়
মাটির নিকানো উঠানে দিন ডুবে যায় 
সাঁঝের আকাশে মুছে যায় দিগন্ত
ম্লান হয়ে আসে সমস্তরেখা

সাঁঝের বেলায় কৃষকবধুর হাতে প্রদীপ
দেশ বোঝে না, কাল বোঝে না
অন্ধকার ভরা রণক্ষেত্রে সীমানা খোঁজে না
মধ্যরাতে 
সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে চূর্ণীর জীবনস্রোত

[পপ আপ এলার্ট]
"ক্রিং ক্রিং ক্রিং(হট লাইন)"
অর্থাৎঃএক্সকিউজ মি...
"আলফা আলফা আলফা, ক্রস ল্যান্ডিং, হ্যালো বেস কমান্ডার ? "
অর্থাৎঃ বলো কোন পার ভিড়িবে তোমার সোনার তরী  ?

[রিক্যাপ]
করোটির দু দিকে দুটো গোল গোল কোটরে
জ্বালিয়ে  যুদ্ধ-জিঘাংসা
দুর্দম প্রচণ্ড দেগে আগুনের গোলা
উড়ান দিয়েছে সুপারসোনিক মিগ টোয়েন্টি ওয়ান

তার স্ফুলিঙ্গের আলোয় আলোকিত হচ্ছে
চেনাবের সমস্ত গিরিখাত
বিপাশা , শতদ্রুর ঢেউয়ে, তার বিচ্ছুরিত আলোয়
সার্ভিস ক্যাপ অন
এক সামান্য এয়ারম্যান
তার জীবনের স্রোত খুঁজে ফেরে ।



৮ জানুয়ারী ১৯৯৬
সতওয়ারী, জম্মু এন্ড কাশ্মীর ।


কারাকোরামের পথে

তারপর যেতে যেতে যেতে পথে হঠাৎ একদিন
কারাকোরামের সাথে দেখা
কাছিমের খোলার মত আকাশ উল্টে
দাঁড়িয়ে আছে তার কাঁধে
লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে
দিনরাত পাহারায়
সারি সারি সরলবর্গীয় উদ্ভিদের সাথে
তারা তাঁবু খাটিয়েছে ।


দেবদারু, শিশু, ফার, পাইনের বাহিনীতে
কারা গো রাম, কারাকোরাম
কারা রহিম ?
অগ্নিগর্ভ অভিযানের অহংকারী পদচিহ্ন
পেজা তুলোর মত শুভ্র তুষারপাতে
কবেকার হিমবাহে মিশে গেছে ।

কারাকোরামের আঁখি মুদে আছে শ্যাওলায়
দুঃখ জরা ব্যাধীতে সে বধির ও মূক
চমরী গায়ের দুধে হিমবাহী নদী
ভরে নেয় স্তন , অপুষ্ট বুক

ভূস্বর্গ কাশ্মীর
অগ্নিগর্ভা ফিনিক্সের পাখনা
বাপেরই নিজের গর্ভে জমেছে পাহাড়ী গণিত নিয়ে
দুর্গম জ্যামিতির প্রতিটা মাইলস্টোনে
খোদায় করে চলেছে সীমারেখা

কোথায় চলেছে এই রেখা ?
এই পথ ?

যে দিকেই তাকাই
মজদুর হিমালয়
নিজেরই পর্বত ভাঙতে থাকে
পাহাড়ী গ্রাম দুরমুস করে
পরিব্রাজকের পায়ে সড়ক বানায়

কারা এই পথচারী টাইগার হিল ? জুবার হাইটস ?
কারা এই রহিম,
কারা বা রাম ?
কাদের এই মার্গ, এই পথ ?

বেলচা,  কোদাল নিয়ে কঠিন দুহাতে
মাথাটা হাটুতে নামিয়ে
ফিবছর অবিরাম

কাদের ভাঙছ তুমি কারাকোরাম ?


১২ আগস্ট, ১৯৯৭
সতওয়ারী, জম্মু

পিপাসিত প্যারাস্যুট


পিপাসিত প্যারাস্যুট


পিপাসিত প্যারাস্যুটের প্রতিদিনের প্রাসঙ্গিক সুরাপান
ঘুম ঘুম চোখে ঢুলছে
মাতাল বিমান
বাপ রে  কী রোমান্স!
টানটান শরীর, স্নায়ু-যুদ্ধ, লিঙ্গ উত্তোলন
সিভিল ডিফেন্স, সীমা সুরক্ষা বল
তারপর ?
হিমায়িত ফ্রী-ফল ?

আকাশটা ছাতাকারে মুঠোর ভিতর
একহাতে পানীয়
অন্যহাতে মাটি
রানওয়ের দুপাশে ইতিহাসের সামরিক ঘাটি,
এভাবে অনেকদিন, এরপর অনেক বছর
শ্যাওলায় ঢেকে গেছে জীবাস্ম প্রস্তর 

প্রস্তর তাম্র, প্রস্তর লৌহ , কার্বণ
পিপাসিত প্যারাস্যুট বার মাস তের পার্বন ।


১২ জুন, ১৯৯৭

সতওয়ারী, জম্মু

চোলি কে পীছে ক্যা হ্যায়



চোলি কে পীছে ক্যা হ্যায়

বারুদের বাদামী ধোঁয়া বাঁচিয়ে
শ্রাবনের যে রামধনু রাঙালো আকাশ,
সেই রঙে রাঙিয়েছিলাম এই চোলি তোমার জন্য, সুমনা
তুমি বলেছিলে,
ডালিমের কোয়া ছুঁতে হলে ঠোঁটে
সাতরঙা চোলিতে সাজাতে হবে তোমার মুখাবয়ব ।
ফুলে ঢাকা পালঙ্ক সজ্জায় আমার গর্বিত চোখের সামনে তুমি
উন্মোচিত করবে বিশ্ব ।
তোমার বুকের আতর গন্ধে
আমার গায়ে মাখা বারুদের গন্ধ
দূরীভূত হবে ভেবেই,
এই চোলিতে লিখেছিলাম
'সত্যমেব জয়তে' ।

আমার বুকের মাঝখানে জিভ রেখে, প্রেমের বিষ মাখিয়ে
বলেছিলে, যেখানে রয়েছে তোমার হৃদয় --
কিস্তোয়াড়ের পথে রামবেন ক্যাম্পে,
আমাকে ছুঁয়ে গেছে মুক্তির বিস্ফোরণ,
মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেছে আর ডি এক্সের ঝড়
চোখের পাতায় বসেছে টি এন টির আধপোড়া কালি
বুকের এখানে এখন ফেটে যাওয়া বুলেটের নীল ঘা
সেই ক্ষত,
উর্দির অজীর্ন ঘামে মাখা মাখি হবে বলে
সেই চোলিতে ঢেকে দিয়ে গিয়েছে কারা ।

বারুদের বাদামী ধোঁয়া বাঁচিয়ে
শ্রাবনের যে রামধনু রাঙালো আকাশ
ওই রঙে রাঙিয়েছিলাম এই চোলি, তোমার জন্য সুমনা
তা এখনো আমার বুকের উপরে ।

শুধু
রক্ত আর পুঁজে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে
'সত্যমেব জয়তে' । 


সতওয়ারী, জম্মু
২০-০৭-১৯৯৭

যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন


যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন

উড়ানে মিশে গেল একদল রামধনুর ঝাঁক
লুব্ধকের তীব্র আবেগে ছিন্নভিন্ন আকাশে তখন আলোকের জটলা
বেনীআসহকলা...

"মিগ ২৯ ক্রাশড"

আমার প্রিয়ার হাতে
ফিল্ড এরিয়ার স্ট্যাম্প মারা ফ্রী ইনল্যান্ড

দীপ ছিল শিখা ছিল বুকে জ্বলে জ্বলে উদাসী
মৌ ছিল , মধু ছিল ভরা অনাস্বাদিত ,অনাঘ্রাত
মুকুল ছিল, ফুটত হয়তো কলি
ঐ আসে ঐ বুঝি উড়ে আসে অলি...

মেঘের আড়ালে দেখেছ তোমরা আধফালি চাঁদ
তারকাদের মাঝে টুকরা টুকরা বিমানের ধ্বংসাবশেষ

ঐ দেখ, ছত্রভঙ্গ নক্ষত্রদের পশ্চাদ্পসরণ
ডানা ঝাপটায়ে ঘরে ফেরে পরাজিত মেঘ

মিলাচ্ছে রামধনু সন্ধ্যার আকাশে
আমারই চিতার আগুনে

সর্বগ্রাসী আলোক উৎসবে !


১২ অক্টোবর, ১৯৯৭
সতওয়ারী, জম্মু